কবি নজরুল’ ভাস্কর্যে উপেক্ষিত শিল্পী; পায়নি সর্ম্পূণ পারিশ্রমিক

দ্বারা hello@anbnews24.com
কবি নজরুল' ভাস্কর্যে উপেক্ষিত শিল্পী; পায়নি সর্ম্পূণ পারিশ্রমিক

জাককানইবি প্রতিনিধি: কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২২তম জন্মজয়ন্তীতে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ‘কবি নজরুল’ ভাস্কর্য নির্মাণ অসম্পূর্ণ রেখেই উদ্বোধন করছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।উদ্বোধনকে কেন্দ্র করে বহু বিতর্কের সৃষ্টি হয়েছে।

কবি নজরুল ও বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের নির্মাণ  শিল্পী ভাস্কর শ্যামল চৌধুরীর পারিশ্রমিক সম্পূর্ণ  পরিশোধ করা হয়নি।  । কাজ চলমান রাখার জন্য শ্যামল চৌধুরীকে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে চাঁদা দাবি করার অভিযোগ উঠেছে। তাছাড়া একাধিকবার কাজ বন্ধ রাখারও অভিযোগ উঠে। অন্যদিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনৈতিক সংকটের কথা বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কম পারিশ্রমিকে শিল্পীর কাছ থেকে  কাজ করিয়ে নিয়েছে।  উল্লেখিত দুটি ভাস্কর্যের উদ্বোধন অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ না পাওয়া এবং উদ্বোধন ফলকে নামের অবস্থানের বিষয়ে ভাস্কর শ্যামল চৌধুরীকে উপেক্ষা করায় তিনি অপমানিত বোধ করেছেন বলেও জাককানইবি প্রেসক্লাবকে জানান।এ নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেইসবুকে তীব্র সমালোচনার ঝড় বইছে।

 ভাস্কর্যের নির্মাণ পরবর্তী রূপসজ্জা ও ভাস্কর্যের শিল্পী শ্যামল চৌধুরীকে তার সৃষ্টিকর্মে উপেক্ষা করা নিয়ে নেটাগরিক ও শিল্পবোদ্ধারা  সরব হয়ে উঠেছেন। উদ্বোধন ফলকে ভাস্কর্যের নাম ‘কবি নজরুল’ এর সাথে ভাস্কর্য শব্দ জুড়ে দিয়ে ‘কবি নজরুল ভাস্কর্য’ রাখা শিল্পগত জায়গায় কতটুকু যৌক্তিক এব্যাপারে জানতে চাইলে শিল্পী শ্যামল চৌধুরী বলেন, এমনটি কোথাও নেই। একইসাথে নামফলকে ভাস্করের নামের অবস্থান তলানীতে থাকায় তিনি ক্ষোভপ্রকাশ করে বলেন, এটি শিল্পীর জন্য অপমানজনক ও লজ্জার।

ভাস্কর শ্যামল চৌধুরী সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে ৬ মাস ধরে শয্যাশায়ী। এ অবস্থায় তিনি কথা বলতে অসুবিধা বোধ করায় তার স্ত্রী মুনী চৌধুরীর সাথে কথা বললে তিনি জানান, গত ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি (ভাস্কর) বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ভাস্কর্যের চূড়ান্ত কাজ সমাপ্ত করে আসেন। এরপরে তিনি দুর্ঘটনার কবলে পড়েন, পবর্তীতে করোনাক্রান্ত হোন । আমরা যে কি খারাপ সময়ের ভেতর দিয়ে গিয়েছি, কেউ খোঁজ নেয়নি আমাদের। তিনি আরও  বলেন, ভাস্কর্যের জন্য উনাকে চুক্তিবদ্ধ করার আগে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তাকে (ভাস্কর) বলে, তাদের বাজেট ছিল না। তারা রিকোয়েস্ট করছে যে আমরা এটা করাইতে চাই, কিন্ত্; আমাদের বাজেট নাই। আমাদের নতুন ইউনিভার্সিটি আপনি যদি এটা করে দেন। । প্রকল্পের কাজ শেষ হলেও এখনও প্রশাসনের কাছে আনুমানিক ৯ লাখ টাকা পাননি বলেও জানান শ্যামল চৌধুরীর স্ত্রী।

প্রকল্প দুটির বিষয়ে অনুসন্ধানে নেমে জানা যায়, ২০১৭-১৮ অর্থবছরে শুরু হওয়া দুটি ভাস্কর্যের কাজ ২০১৯ সালের জুন-জুলাই মাসে সম্পন্ন করার কথা থাকলেও নির্ধারিত সময়ে তা বাস্তবায়ন করতে পারেনি প্রকল্পটির ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সুতিয়া কর্পোরেশন। সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে অর্থ ছাড়ের পরিমান। যার অর্থনৈতিক হিসাব ৪২ লাখ টাকা থেকে বেড়ে ১ কোটি ১২ লাখে পৌঁছেছে কেবল দুটি ভাস্কর্যের বেদী নির্মানেই।

 উদ্বোধন ঘোষণার মুহূর্তে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য এবং ট্রেজারারের সামনেই বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের পলেস্তারা খসে পড়তেও দেখা গিয়েছিলো। বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের কাজ সম্পন্ন করার আগে উদ্বোধনের ফলে প্রকল্পের বাইরে গিয়ে ব্যয় করতে হয়েছিলো অতিরিক্ত অর্থ। একই ভাবে নির্মাণ কাজ সম্পন্ন করার পূর্বে নজরুল ভাস্কর্যের উদ্বোধনের কারনে ব্যয় বাড়বে বলে আবারো জানিয়েছে নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট সূত্র। সাদা কাপড়ে অসম্পূর্ণ ভাস্কর্যের নিচের অংশ মুড়িয়ে এবং লাল গালিচার ব্যবহার করে মঙ্গলবার (২৫মে) বেলা সাড়ে ১১টায় কবির ১২২ তম জন্মদিনে পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান নজরুল ভাস্কর্যের উদ্বোধন ঘোষণা করেন। অসম্পূর্ণ ভাস্কর্য ও বিতর্কিত নাম ফলকে ভাস্কর্যের উদ্বোধন প্রসঙ্গে জানতে চাইলে পরিকল্পনা ও ওয়ার্কার্স দপ্তর প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান বলেন, ভাস্কর্যে কত টাকা ব্যয় হয়েছে না দেখে বলতে পারবো না, অসমাপ্ত কাজ কেন উদ্বোধন করা হয়েছে এইটা তো আমি বলতে পারবো না। বিতর্কিত নাম ফলকের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি কিছু বলতে পারবো না, সবাইকে (প্রকল্পে নিয়োজিত কমিটি) বলেন। ম্যানেজমেন্টের সাথে কথা বলেন। প্রকল্প উদ্বোধন হয়ে গেলেও ভাস্কর তার প্রাপ্য পারিশ্রমিক কেন পাননি, আমন্ত্রণ কেন জানানো হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, টাকা নেওয়ার জন্য তো তারা আসবেন। ম্যানেজমেন্টে তিনি নিজে থাকার পরেও ম্যানেজমেন্টের দোহাই দিয়ে দায় এড়িয়ে যাচ্ছেন । এ ব্যাপারে তিনি অপারগতা পোষণ করেন।

 অন্যদিকে প্রকল্প প্রধান বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্যকে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এসব বিষয়ে জানার জন্য আপনি প্ল্যানিং দপ্তরকে ফোন দেবেন। প্ল্যানিং দপ্তর প্রধান প্রকৌশলী হাফিজুর রহমান ম্যানেজমেন্টের (উপাচার্য, রেজিস্ট্রার, প্রক্টরসহ কমিটির অন্যান্য সদস্য) সাথে যোগাযোগ করতে বলেছেন এমন বললে উপাচার্য দ্বিমত পোষণ করে বলেন, না, না, তিনি এমনটি বলতে পারেন না।রেজিস্ট্রারের সাথে কথা বলতে বলেন। রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) কৃষিবিদ ড. হুমায়ুন কবিরকে ফোন দিলে তিনি বলেন, এটি করা হয়েছে কমিটির মাধ্যমে। এটি একা কারোর সিদ্ধান্ত না। এখানে চারুকলার লোক ছিল, সঙ্গীতের লোক ছিল, প্রশাসনের লোক ছিল, কম্পিউটার এক্সপার্ট ছিল, প্রক্টর ছিল।তাদের  দায় এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নাই।

প্রকল্পটির স্বার্থে চারুকলা বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ড. এমদাদুর রাশেদ সুখন বলেন, এক্ষেত্রে চারুকলা বিভাগের সংশ্লিষ্টদের সাথে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারত । কিন্ত; এমনটি করা হয়নি, করা হলে আমরা অবশ্যই ইতিবাচক পরামর্শ দিতাম। এ ব্যাপারে ফোকলোর বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ও লেখক মেহেদী উল্লাহ বলেন, ‘যে নামফলকটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখলাম, তাতে ভাস্করের অবমূল্যায়ন আমাকে ব্যথিত করেছে! শিল্প ও শিল্পীর গুরুত্ব বিশ্ববিদ্যালয়ে সংস্থিত হওয়া উচিত। ভাস্করের নাম খোদিত হয়েছে সবচেয়ে নিচে! ‘ভাস্কর্য’ কথাটি লিখে বুঝিয়ে দিতে হয়েছে এটি ভাস্কর্য! ফলকের শুরুতে ভাস্কর্যের নাম ও ভাস্করের নাম দিয়ে, উদ্বোধনের তথ্য দেওয়া যেতো। সবচেয়ে নিচে থাকতে পারে বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম৷ এতে শিল্পের প্রতি আমাদের দায়বোধ ও নন্দনচিন্তা দুটিই রক্ষিত হতো।’ ভুলেভরা ও বিতর্কিত নামফলকের বিষয়ে চারুকলা বিভাগের সহকারী অধ্যাপক কল্যানাংশু নাহা বলেন, এটি শিল্পের জন্য অবশ্যই অপমান জনক, একইসাথে যিনি শিল্পকর্মটির স্রষ্টা সেই শিল্পীকে এখানে অপমান করা হয়েছে। যেটি অত্যন্ত লজ্জার। আমরা চাইবো অতি দ্রুত এমন ভুলের নিরসন ঘটিয়ে কর্তৃপক্ষ তার সমাধান করুন। প্রয়োজনে দুটি আলাদা নাম ফলকের একটিতে শিল্পের নাম ও শিল্পীর নাম অন্যটিতে বর্তমান নাম ফলকের বাকি তথ্যগুলো দেওয়া যেতে পারে বলে আমি মনে করি।

 

 

শেয়ার করুন
0 মন্তব্য

মতামত দিন

Related Articles