শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত

দ্বারা hello@anbnews24.com
শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করেশিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত

লালমোহাম্মদ :

সুত্র:  জাতীয় দৈনিক: এএনবি নিউজ ডেস্ক: 

সার্বিক দিক বিবেচনায় বাংলাদেশ সরকারও ১২ সেপ্টেম্বর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর কোনো বিকল্প ছিল না। অনলাইনে পাঠদান সার্বিক সফলতা লাভ করতে পারেনি। তবে যে ১১টি নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে, তা মনিটর করতে হবে। এখানে তাড়াহুড়োর কিছু নেই। গত ১৮ মাসে শিক্ষার্থীরা যা হারিয়েছে তা ফেরত পাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, স্কুল বন্ধ থাকার কারণে সারা বিশ্বে ১৬০ কোটি শিশু পড়াশোনার বাইলে চলে গেছে। শিক্ষার যে পরিমাণ ক্ষতি হয়েছে, শিশুর ভবিষ্যৎ আয়ের হিসাব করলে তা দাঁড়ায় প্রায় ১০ লাখ কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশের চলতি বছরের জিডিপির প্রায় ২৮ গুণ)। সুতরাং যা হারিয়েছি, তা ফিরে পাওয়ার চেষ্টা না করে মনোযোগ দিতে হবে যাতে আগামীতে হারানোর মাত্রাটা কম হয়। এ কারণে একটু সময় নিয়ে হলেও শিক্ষার্থীদের বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। ক্লাসের সংখ্যা কমিয়ে দিতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত অনেক আচরণই শিশুদের কাছে বিরক্তিকর। সেক্ষেত্রে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলায় তাদের অভ্যস্ত করে তুলতে হবে। তবে সেক্ষেত্রে জবরদস্তির বিপরীতে মোটিভেশনের দিকে জোর দিতে হবে। এসব দিকে খেয়াল রেখেই সরকার এগোচ্ছে বলে মনে হয়। সরকারের তরফ থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার বিষয়ে যা কিছু বলা হয়েছে তা সন্তোষজনক। তবে প্রশ্ন বাস্তবায়ন নিয়ে। আমাদের মনে সংশয়ের জন্ম হওয়ার পেছনে কারণ হলো স্বাস্থ্য খাতে দেখা দুর্বলতাগুলো। বলার ক্ষেত্রে স্বাস্থ্য খাতেও কমতি ছিল না। কিন্তু বাস্তবে সে চিত্র আমরা দেখতে পাইনি। আমরা নিশ্চয়ই আশা করব স্বাস্থ্য খাতের অব্যবস্থাপনার পুনরাবৃত্তি যেন শিক্ষা খাতে না হয়।

একটানা দেড় বছরেরও বেশি সময় পর আজ সারা দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হলো। এর মধ্য দিয়ে প্রায় ২৭ হাজার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ৩ কোটি ৭০ লাখ শিক্ষার্থী যেন প্রাণ ফিরে পেল। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার একটি সাধারণ পরামর্শ ছিল-শনাক্তের হার ৫ শতাংশের নিচে নেমে এলেই যেন সবকিছু খুলে দেওয়া হয়। গেল সপ্তাহজুড়ে আমাদের গড় শনাক্তের হার ১০ শতাংশের নিচে ছিল; তবে তা ৫ শতাংশের কাছাকাছি নয়। তারপরও অনেকটা ঝুঁকি নিয়েই, সাধারণ শিক্ষার্থীদের মানসিক অবস্থা বিবেচনায় নিয়েই সরকার এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আমাদের দেশে এখন করোনার দ্বিতীয় ঢেউ চলছে। তবে বিশেষজ্ঞরা আগামী কয়েক মাসে তৃতীয় ঢেউয়ের আশঙ্কাও করছেন। তারপরও সরকারকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার সিদ্ধান্ত নিতে হলো শিক্ষার্থীদের স্বার্থের কথা বিবেচনা করে। তাছাড়া গত দেড় বছরের অভিজ্ঞতায় আমরা যা উপলব্ধি করেছি তা হলো, করোনাকে ভয় করে এড়িয়ে যাওয়া যাবে না বরং তা মোকাবিলা করে এগিয়ে যাওয়ার নীতি-কৌশল শিখতে হবে; জানতে হবে করোনার সঙ্গে বাস করার জীবন পদ্ধতি।

বিশ্বের কোনো প্রান্ত থেকেই করোনা বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। তবে টিকা কর্মসূচি জোরদার করার কারণে সংক্রমণের গড় হার কমে এসেছে। এটুকু উন্নতির ওপর ভর করেই বিশ্বের ১৪১টিরও বেশি দেশ সরাসরি শিক্ষা কার্যক্রম শুরু করেছে। কোনো কোনো দেশ কার্যক্রম চালুর প্রস্তুতি নিচ্ছে। যেহেতু আক্রান্তের সংখ্যা সব দেশে সমান নয়, তাই কার্যক্রমের পরিধিটাও সব দেশে সমান নয়। তবে কোনো দেশেই তা পূর্ণাঙ্গ নয়, বরং আংশিক। ইউরোপের দেশ যুক্তরাজ্যে শরৎকালীন শিক্ষাবর্ষ শুরু হওয়ার কথা ছিল গত ১ সেপ্টেম্বর। কিন্তু তা বিরূপ পরিস্থিতির কারণে করা যায়নি। এখনো সেখানে প্রতিদিন গড়ে প্রায় ৪০ হাজার মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। যদিও আক্রান্তের সংখ্যাটা এ বছরের শুরুতে ছিল দৈনিক ৬০ হাজার। কিন্তু তারপরও যুক্তরাজ্য সরকার নির্বিঘ্নে পাঠদান চালুর বিষয়ে তৎপর। এই তৎপরতার অংশ হলো টিকাদান কর্মসূচিকে বেগবান ও সম্প্রসারিত করা। এরই মধ্যে ১৬ থেকে ১৮ বছর বয়সিদের টিকাদান শুরু হয়েছে। সেদেশের সরকার ভাবছে, খুব দ্রুতই ১২ থেকে ১৫ বছর বয়সিদের টিকার আওতায় আনা হবে। সব মিলে বলা যায়, একটি নিশ্চিত পাঠদানের ব্যবস্থার দিকে তারা এগিয়ে যাচ্ছে।

ইউরোপের আরেকটি দেশ ফ্রান্স। দেশটিতে গত বছরের এ সময়ে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল দৈনিক ৫০ হাজারেরও বেশি। এ বছর পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে, আক্রান্তের সংখ্যা নেমে এসেছে ১০ হাজারে। ফ্রান্স সরকার গত ২ সেপ্টেম্বর থেকে স্কুল খুলে দিয়েছে এবং ১ কোটি ২০ লাখ শিশু স্কুলে ফিরেছে। এর পাশাপাশি টিকাদানে অনেকটা এগিয়ে রয়েছে। টিকাপ্রাপ্তির বয়সসীমা ১২ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে। তবে স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কঠোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

করোনাভাইরাস ইতালিকে পর্যুদস্ত করে ফেলেছিল। সেরকম একটি ভয়াবহ পরিস্থিতি থেকে তারা ফিরেছে এবং এ মাসের প্রথম সপ্তাহ থেকে স্কুল-কলেজগুলো খুলে দিয়েছে। ইউরোপের আরেক দেশ জার্মানিতে অবশ্য আগস্ট মাসেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে। সেখানেও স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার কঠোর বাধ্যবাধকতা রয়েছে।

শনাক্ত বিবেচনায় এশিয়ার বৃহত্তম এবং বিশ্বের দ্বিতীয় বৃত্তম দেশ ভারত। মৃতের সংখ্যা বিবেচনায় দেশটির অবস্থান বিশ্বে তৃতীয়। দ্বিতীয় অবস্থানে ব্রাজিল আর শীর্ষে অবস্থান করছে যুক্তরাষ্ট্র। মে মাসের প্রথম সপ্তাহে দেশটিতে দৈনিক শনাক্ত হয়েছিল কম-বেশি ৪ লাখ মানুষ। সে সংক্রমণ এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রিত। ৫ সেপ্টেম্বর দেশটিতে শনাক্ত হয়েছে ৪০ হাজার মানুষ। এ পরিস্থিতিতে গত ১ সেপ্টেম্বর থেকে বিভিন্ন রাজ্যে পর্যায়ক্রমে স্কুল-কলেজ খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে এবং তা বর্তমানে কার্যকর। স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার পাশাপাশি টিকাদান কর্মসূচিও বেগবান করা হয়েছে। এরই মধ্যে টিকাপ্রাপ্তির বয়সসীমা ১৮ বছর থেকে ১২ বছরে নামিয়ে আনা হয়েছে।

তুরস্কের করোনা পরিস্থিতি এখনো উদ্বেগজনক। বর্তমানে দেশেটিতে প্রতিদিন গড়ে ২০ হাজারেরও বেশি মানুষ আক্রান্ত হচ্ছে। এর ভেতরেই গত ৬ সেপ্টেম্বর থেকে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে। তবে গ্রহণ করা হয়েছে ব্যাপক কর্মসূচি। তুরস্কের সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে মাস্ক ও জীবাণুনাশক ক্রয় ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য ৮০ কোটি মার্কিন ডলার বরাদ্দ দিয়েছে। পরিচ্ছন্নতার কাজটি নিশ্চিত করতে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে ১ লাখ ১৩ হাজার কর্মী। বাধ্যতামূলক করেছে শিক্ষক-অভিভাবকদের পূর্ণ ডোজ টিকা।

যে দেশ থেকে করোনাভাইরাসের উৎপত্তি সেই চীনে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে। এশিয়ার আরেকটি বড় আক্রান্তের দেশ ইন্দোনেশিয়া। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলে দেওয়া হয়েছে ৩০ আগস্ট। সেখানে বর্তমানে সংক্রমণের হার ৫ শতাংশের নিচে।

 

আজ থেকে স্কুল-কলেজগুলো খুলে দেওয়া হলেও উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-বিশ্ববিদ্যালয়গুলো খুলতে একটু সময় লাগবে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলো স্বায়ত্তশাসিত হওয়ায় স্ব-স্ব বিশ্ববিদ্যালয় খোলার সিদ্ধান্ত নেবে স্ব-স্ব কর্তৃপক্ষ। দেশে সরকারি ও বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-বিশ্ববিদ্যালয় আছে প্রায় দেড়শ এবং শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৮ লাখ। এর মধ্যে সরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আছে ৪৪টি এবং এগুলোর শিক্ষার্থী সংখ্যা প্রায় ৪ লাখ ৫০ হাজার। স্কুলের শিশুদের বেলায় যেসব সমস্যা রয়েছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পরিণত হওয়ায় সেসব সমস্যার অনেকগুলোই তাদের ক্ষেত্রে দেখা যাবে না। তারা নিজেদের বিবেচনা দিয়েই স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে পারবে। কিন্তু বিশ্ববিদ্যালয়ের সংবেদনশীল অংশ হলো আবাসিক হলগুলো। সেক্ষেত্রে হল প্রশাসনকে অতিরিক্ত দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে হবে। পরীক্ষাগুলো এমনিতেই শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে নেওয়া হয়। কিন্তু ক্লাসের ক্ষেত্রে সে দূরত্ব বজায় রাখা যায় না। তাই পরীক্ষামূলকভাবে ৫০ শতাংশ করে দুই শিফটে ক্লাস চালুর ব্যবস্থা করা যেতে পারে। প্রয়োজনে ক্লাসের সংখ্যা কমে গেলেও এর সঙ্গে ক্ষতির ঝুঁকিও কমবে। তবে সবচেয়ে ভালো হয় প্রথমে মাস্টার্স ও অনার্সের চূড়ান্ত পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হলে। সেই সঙ্গে সবাইকে টিকার আওতায় নিয়ে আসতে পারলে অনেকটা স্বস্তি পাওয়া যাবে। চেষ্টা থাকলে সে কাজটি অল্প সময়ের মধ্যেই করা সম্ভব। মাত্র ৮ লাখ শিক্ষার্থীর টিকা নিশ্চিত করা কোনো অসাধ্য কাজ নয়।

সমস্যা কোনো সমস্যা নয়, সমস্যার সমাধানটাই সমস্যা। গতকালের সমস্যার সঙ্গে আজকের সমস্যার ভিন্নতা থাকতে পারে। কিন্তু সমাধানের পথ খোঁজার আন্তরিক প্রচেষ্টা থাকতে হবে। যেহেতু করোনাভাইরাস একটি সামগ্রিক সমস্যা, তাই এর মোকাবিলায় চাই সার্বিক প্রচেষ্টা।

এই সার্বিক প্রচেষ্টার কাজটি সমন্বয় করার দায়িত্ব সরকারকেই নিতে হবে।

 

 

শেয়ার করুন
0 মন্তব্য

মতামত দিন

Related Articles