বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বাল্যবিয়েতে অন্যতম

দ্বারা hello@anbnews24.com
বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে বাংলাদেশ বাল্যবিয়েতে অন্যতম

লালমোহাম্মদসুত্র:( জাতীয় দৈনিক) করোনার প্রভাবে দীর্ঘ প্রায় দেড় বছর বন্ধ ছিল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। এই দেড় বছরে অনেকের সহপাঠিদের সাথে যোগাযোগ ছিল না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খোলার পর স্কুলে গিয়ে দেখা যায় ব্রেঞ্চের পাশে বসা বান্ধবি আর স্কুলে আসছে না। পরে জানাতে পারেন তার বিয়ে হয়ে গেছে। এ ধরনের ঘটনা দেশের প্রায় গ্রাম-গঞ্জেই। শিক্ষাসংশ্লি্লষ্টরা বলছেন, চরাঞ্চল ও হাওর-বাঁওড় এলাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার শতকরা ৫০ শতাংশেরও বেশি। স্কুল ছেড়ে সংসার জীবন শুরু করেছে ৩০ শতাংশ ছাত্রী। অনেক জেলায় এ সংখ্যা ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। সমপ্রতি ব্র্যাকের এক ডিজিটাল সংলাপে শিক্ষাসংশ্লি্লষ্টরা বলেন, বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ।

দেশের সর্বউত্তরের জেলা পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়া উপজেলার রণচন্ডী দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীতে ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে নিবন্ধিত হয় ৩৬ জন ছাত্রী। এর মধ্যে এসএসসি পরীক্ষার ফরম পূরণ করে মাত্র ১৯ জন ছাত্রী।

ওই স্কুলের সহকারী শিক্ষক (লাইব্রেরিয়ান) আবদুল্লাহ আল ফারুক জানালেন, করোনাকালের প্রায় দেড় বছরে ড্রপআউট হয়ে গেছে ১৭ জন ছাত্রী। এই ড্রপআউট হওয়া মানে ঝরে পড়ার কারণ, ছাত্রীদের বড় একটা অংশের বিয়ে হওয়া এবং গরিব বাবা-মার অভাব অনটন। একই অবস্থা তেঁতুলিয়ার কাজী শাহাবুদ্দিন বালিকা উচ্চবিদ্যালয় ও কলেজের। প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক জানালেন, ২০১৯-২০ বর্ষে তার কলেজ শাখায় ২২৩ জন ছাত্রী ভর্তি হয়েছিল। এর মধ্যে পরীক্ষার জন্য ফরম পূরণ করে ১৬০ জন। বাকি ৬৩ জন শিক্ষার্থী বিয়েশাদি, দরিদ্রতাসহ নানা কারণে ঝরে পড়েছে। শিক্ষার্থীদের এভাবে ঝরে পড়ায় তিনি উদ্বিগ্ন। শুধু এই দুটি প্রতিষ্ঠানই নয়, ঢাকাসহ সারা দেশেরই প্রাইমারি স্কুল থেকে শুরু করে মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় একই চিত্র। টানা দেড় বছর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে ড্রপআউট হওয়ার প্রবণতা। অভাব অনটন, অসচেতনতা ইত্যাদির কারণে অনেক বাবা মা-ই তার মেয়েকে বিয়ে দিয়ে দিচ্ছেন। এতে আশঙ্কাজনকহারে বাড়ছে বাল্যবিয়ে।


শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, চরাঞ্চল ও হাওড়-বাঁওড় এলাকায় শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার শতকরা ৫০ শতাংশেরও বেশি। পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টার (পিপিআরসি) এবং ব্র্যাক ইনস্টিটিউট অব গভর্নমেন্ট অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (বিআইজিডি) এক যৌথ গবেষণায় গত বছর বলা হয়, প্রাথমিকের ১৯ শতাংশ ও মাধ্যমিকের ২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী করোনার এই সময়ে নিয়মিত পড়াশোনার একদম বাইরে রয়েছে। এ গবেষণায় এমন প্রেক্ষাপটে মা-বাবাদের চিন্তাভাবনার চারটি মৌলিক দিক উঠে এসেছে। এগুলো হলো- শিক্ষার প্রতি শিক্ষার্থীদের আগ্রহ কমে যাওয়া, শিক্ষার খরচ তুলনামূলকভাবে বেড়ে যাওয়া, স্কুল খোলার সময় নিয়ে চিন্তা এবং পড়াশোনার পাশাপাশি কর্মসংস্থানজনিত উদ্বেগ। এদিকে প্রায় ৬৫ হাজারেরও বেশি কিন্ডারগার্টেন স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকদের কেউ কেউ ভিন্ন পেশা বেছে নিয়েছেন।


চলতি বছরে এইচএসসি পরীক্ষা দিতে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের অধীনে মোট ১ লাখ ৪২ হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধিত হয়েছিল। কিন্তু পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছে প্রায় ১ লাখ ১১ হাজার শিক্ষার্থী।

কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আবদুস ছালাম জানালেন, করোনা মহামারী উদ্ভূত নানা দৈন্যতার কারণেও শিক্ষার্থী কমছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় পাঠবিমুখ হয়েছে ছেলেরা। পরিবারের পক্ষ থেকে তাদের নানা কাজে জড়ানো হচ্ছে। স্কুল-কলেজের অনেকের বিয়ে হয়ে যাচ্ছে।

মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড, ঢাকা সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষে একাদশ শ্রেণীতে নিবন্ধন করেছিল ৩ লাখ ৩৭ হাজার। এরাই চলতি বছরের এইচএসসি পরীক্ষার্থী হিসেবে ফরম পূরণ করার কথা। এদের মধ্যে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করেছে মাত্র ২ লাখ ৯০ হাজার। আবার এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছে অনিয়মিত শিক্ষার্থীও। সবমিলে শুধু এইচএসসিতেই ঢাকা বোর্ডে ফরম পূরণ করেনি প্রায় অর্ধ লাখ ছাত্রছাত্রী। এ শিক্ষা বোর্ডে নবম শ্রেণীতে নিবন্ধন করেছিল ৬ লাখ ৩০ হাজার ১৪৪ জন। এদের মধ্যে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিতে ফরম পূরণ করে মাত্র ৪ লাখ ৭০ হাজার। সে হিসেবে এসএসসি পরীক্ষার আগে শুধু ঢাকা শিক্ষা বোর্ডেই ড্রপআউট হয়ে গেছে দেড় লাখের বেশি শিক্ষার্থী।


শিক্ষাবিদরা বলছেন, করোনার প্রভাবে দারিদ্র্যের হার বেড়ে যাওয়াতে অনেক শিক্ষার্থীকে তার পরিবার কাজে লাগিয়ে দিচ্ছে। এ কারণে বেড়ে গেছে বাল্যবিয়ে। বিশেষ করে চর, হাওর ও শহরের বস্তি অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বেশি সমস্যায় পড়ছে। করোনা শেষে শিক্ষাঙ্গন খুললেও এদের অনেকে আর বিদ্যালয়ে ফিরবে না। করোনায় দেশের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার ক্ষতিও ভয়াবহ। গত বছর কোনো বার্ষিক পরীক্ষা ছাড়াই উপরের শ্রেণীতে উঠেছে মাধ্যমিক শিক্ষার্থীরা। ফলে গত বছরের ক্লাসের দক্ষতা ঘাটতি তাদের রয়েই গেছে। এর সঙ্গে যোগ হয়েছে নতুন বছরে নতুন ক্লাসের পড়াশোনা।

সমপ্রতি ব্র্যাকের এক ডিজিটাল সংলাপে শিক্ষাসংশ্লি্লষ্টরা বলেন, বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বিশ্বের শীর্ষ ১০ দেশের মধ্যে অন্যতম বাংলাদেশ। করোনার কারণে এই হার বেড়েছে ২২০ শতাংশ।

ব্র্যাকের নির্বাহী পরিচালক আসিফ সালেহ বলেন, করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় শিশুরা যা শিখেছে তা-ও ভুলতে বসেছে। করোনার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় কত শতাংশ শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে-এর কোনো হিসাব নেই জাতীয় শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) কাছে।

সংস্থাটির মহাপরিচালক হাবিবুর রহমান বলেন, আগামী অক্টোবরে এ নিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করা হবে। এখন পর্যন্ত এর কোনো উপাত্ত সংগ্রহ করা হয়নি বলেও জানান তিনি।

করোনার প্রভাবে রাজধানীর অনেক স্কুলেও শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে ২০ থেকে ৩০ শতাংশ। প্রাথমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ার হার তুলনামূলক বেশি লক্ষ্য করা গেছে। সেগুনবাগিচা হাই স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম ওবাইদুল্লাহ জানান, গত বছর ষষ্ঠ শ্রেণীতে ছিল ৫০ জন ছাত্র। এ বছরে তাদের মধ্যে ৩৫ জন সপ্তম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে। একইভাবে গত বছর স্কুলটিতে সপ্তম শ্রেণীতে শিক্ষার্থী ছিল ৪৬ জন। তাদের মধ্যে চলতি বছরে এসে অষ্টম শ্রেণীতে ভর্তি হয়েছে ৩৫ জনে। তিনি জানান, প্রায় প্রতিটি শ্রেণীতেই উল্লেখযোগ্য শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে। রাজধানীর মগবাজার মধুবাগ শেরেবাংলা স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ড. আবদুস সাত্তার বলেন, করোনার কারণে প্রাথমিকের প্রতিটি শ্রেণীতে ৩০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ঝরে গেছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অনেকে শিশুশ্রমে জড়িয়ে পড়েছে। এ ছাড়া মাধ্যমিকের ২০ শতাংশ ছাত্রছাত্রী ঝরে পড়ছে। তার স্কুলের কোনো কোনো ছাত্র রিকশাও চালাচ্ছে বলে জানান।

কুমিল্লার আদর্শ সদর উপজেলার নিশ্চিন্তপুর এলাকার বাসিন্দা নিমি আক্তার। স্থানীয় আসলাম খান উচ্চ বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণীর ছাত্রী ছিল সে। এক ভাই ও দুই বোনের মধ্যে নিমি সবার ছোট। তার বাবা কুমিল্ল্লার কোটবাড়ির একজন ব্যবসায়ী। নিমি ২০২০-২০২১ শিক্ষাবর্ষের এসএসসির পরীক্ষার্থী ছিল। পরীক্ষা দেয়ার খুব ইচ্ছে থাকলেও গত জুন মাসে করোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পরিবার তাকে বিয়ে দিয়ে দেয়। পড়ালেখা বন্ধ করে কেন বিয়ে দেয়া হলো, জানাতে চাইলে তার ভাই রাকিব জানান, বোনকে দিয়ে তারা চাকরি করাবে না, তাই বিয়ে দিয়েছেন।

এ বিষয়ে কুমিল্লা জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. আবদুল মজিদ জানান, কুমিল্লা জেলায় ৬০৫টি সরকারি ও আধা সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় রয়েছে। করোনায় দীর্ঘ বন্ধের পর উপজেলা এবং জেলা শিক্ষা কর্মকর্তারা বিভিন্ন উচ্চবিদ্যালয় পরিদর্শন করেছে। পরিদর্শনে দেখা গেছে বিদ্যালয়ে গড়ে ৭০-৭৫ ভাগ শিক্ষার্থী উপস্থিত হয়েছেন। প্রতিদিনই স্ব স্ব বিদ্যালয়কে তাদের প্রত্যেক ক্লাসে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি রেকর্ড করে অনলাইনের মাধ্যমে কেন্দ্রে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।

দশম শ্রেণীর ছাত্রী লিজা পড়তেন চট্টগ্রাম নগরীর পোস্তারপাড় সিটি করপোরেশন উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়ে। করোনাকালে স্কুলে যখন লাগাতার ছুটি চলছে, চলতি বছরের সেই মার্চে ফুফাতো ভাইয়ের সঙ্গে পারিবারিক সিদ্ধান্তে তার বিয়ে হয়ে যায় হঠাৎ সিদ্ধান্তে। আবুধাবী প্রবাসী ফুফাতো ভাই বিয়ে সেরে এপ্রিলেই আবার প্রবাস জীবনে ফিরে যান। তবে যাওয়ার আগে লিজাকে পড়াশোনা বন্ধের কড়া নির্দেশ দিয়ে যান তিনি। ফলে নবম শ্রেণীতে এসএসসির জন্য রেজিস্ট্রেশন করেও পরীক্ষার আগে আর ফরম ফিলআপ করতে পারলেন না লিজা। এক ঝটকায় ভেঙে গেল এসএসসি পাস করে কলেজে ভর্তি হওয়ার স্বপ্ন। পড়ার টেবিল ভর্তি অ্যাসাইনমেন্ট, নোটবই, খাতা সবই পড়ে রইল। নগরীর ডবলমুরিংয়ের মনসুরাবাদে লিজার বাবার বাড়ি। স্বামী প্রবাসে থাকলেও লিজাকে চলে যেতে হল রাঙ্গুনিয়ার শ্বশুরবাড়িতে। চট্টগ্রামে পরিসংখ্যানের অংকে ঝরে পড়া এরকম শিক্ষার্থীর সংখ্যা ১৯ হাজার ৭৩৬ জন।

চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডের আওতায় দুই বছর আগে নবম শ্রেণীতে ২০২১ সালের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের জন্য নিয়মিত শিক্ষার্থী হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করে ১ লাখ ৫৩ হাজার ৮১১ জন। এর মধ্যে ছাত্র ৬৭ হাজার ৯৮২ জন ও ছাত্রী ৮৫ হাজার ৬৯৫ জন। ২০২১ সালের জুলাই-আগস্টে এসে ফরম ফিলআপ করেছে ১ লাখ ৩৪ হাজার ৭৫ জন। অনিয়মিত পরীক্ষার্থী হিসেবে ফরম ফিলআপ করেছে ২৬ হাজার ৭৭৫ জন। চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষাবোর্ডের প্রধান স্কুল পরিদর্শক ড. বিপ্লব গাঙ্গুলী বলেন, করোনার এই ধাক্কায় মাধ্যমিকে ঝরে পড়ার লাগাম টানা গেল না। এটা একটা বড় চ্যালেঞ্জ। কারণ সরকার শিক্ষার পেছনে যথেষ্ট পরিমাণে বিনিয়োগ করছে। শিক্ষকদের বেতন বাড়ল। সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এমপিওভুক্ত হল। তারপরও এসএসসির আগে শিক্ষার্থীদের এই ঝরে পড়া খুবই কষ্টদায়ক।

শেয়ার করুন
0 মন্তব্য

মতামত দিন

Related Articles